শনিবার, ২২ জুলাই ২০১৭

English

তিস্তা চুক্তি নিয়ে আবার দেখা যাচ্ছে আশার আলো

প্রকাশিত
এপ্রিল ৬, ২০১৭
news-image

আর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই দিল্লিতে অনুষ্টিত হতে চলেছে ভারত-বাংলাদেশ শীর্ষ বৈঠক। এই বৈঠকে বড়সড় দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আশা করা হচ্ছে, যা এর আগে কখনও হয়নি।

দীর্ঘ আলোচনা এবং গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও দিল্লির কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের ব্যাপক প্রস্তুতির পর এখন দুই দেশের মধ্যে আলোচিত তিস্তার জল বণ্টন নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সব রকমের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই মুহুর্তে মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন দুই দেশের কর্মকর্তারাই।

এ বিষয়ে তারা খুবই সচেতন যে, শেষ ধাপে স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত কোনও চুক্তিই চূড়ান্ত নয়। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের সময় তিস্তার জল বণ্টন চুক্তিতে অনুমোদন দিতে শেষ মুহূর্তে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের অস্বীকৃতির ফলে সেটা আটকে গিয়েছিল। ফলে এবার সেই অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রাখছেন উভয় দেশের কর্মকর্তারা।

প্রশ্ন উঠেছে, কিভাবে দুই দেশের মধ্যকার প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়েছে?

প্রথমত, সবদিক থেকে পাওয়া প্রাথমিক সূত্রগুলো এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তিস্তা ইস্যুতে ৭ থেকে ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য আলোচনার জন্য বাংলাদেশ, ভারত ও বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যকার দৌড়ঝাঁপ এখন পর্যন্ত বেশ ইতিবাচক।

এটা সত্য যে, মমতা বন্দোপাধ্যায় তার দিল্লিবিরোধী প্রচারণাকে একটা উচ্চতা দিয়েছেন। অভিযোগ দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার তাকে এবং তার দলের শাসনাধীন পশ্চিমবঙ্গকে অবজ্ঞা করছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য মমতার যতই উষ্ণতা থাকুক পশ্চিমবঙ্গের জন্য ক্ষতিকর কোনও প্রস্তাবনা তিনি মেনে নেবেন না।

মমতা বন্দোপাধ্যায় এখন এ সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে সম্মত হয়েছেন। শুক্রবার (৭ এপ্রিল) রাতে তার দিল্লি পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ওই রাতেই ভারতের রাজধানীতে পৌঁছাবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আগে একবার আঙুল পোড়ানোর পর এবার বিজেপি’র নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বেশ সতর্ক। প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে সফলভাবে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের কোনও সুযোগ আর হাতছাড়া করতে চাইছে না দিল্লি।

মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘তুই’ সম্বোধনের মতো সম্পর্ক ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে আগামী ৮ এপ্রিল ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে এক আনুষ্ঠানিক নৈশভোজের আয়োজন করেছেন প্রণব মুখার্জি। এই নৈশভোজে মমতা বন্দোপাধ্যায়কেও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও ওই নৈশভোজে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির পক্ষ থেকে মমতা বন্দোপাধ্যায়কে শুধু আমন্ত্রণই পাঠানো হয়নি, এ বিষয়ে ফোনেও কথা হয়েছে তাদের। রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন মমতা।

কলকাতাভিত্তিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর জন্য এই প্রস্তাব গ্রহণের বাইরে কোনও বিকল্প রাখেননি।

প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-ভারত আলোচনায় অগ্রগতির ব্যাপারে এখন খুবই ইতিবাচক দু’টি ইঙ্গিত রয়েছে। প্রথমত, শেখ হাসিনা দিল্লি সফর করছেন; যেটা এর আগে কিছু নেতিবাচক ইঙ্গিতের কারণে স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, তিস্তা চুক্তি নিয়ে এর আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় অংশ নেওয়া থেকে নাটকীয়ভাবে বিরত ছিলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। তার দিক থেকে চুক্তির জোরালো বিরোধিতা এসেছিল। কিন্তু এবার তিনি একই ইস্যুতে দিল্লি সফরে রাজি হয়েছেন। এটা সম্ভব হতো না যদি উভয় নেতা এ বিষয়ে সম্মত না হতেন যে; তিস্তার পানি বণ্টনে সমঝোতা সম্ভব।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পৃথকভাবে একক বৈঠকে অংশ নেবেন মমতা। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মমতা এ বিষয়ে দিল্লির আলোচনায় অংশ নেবেন। কারণ, তার মুখোমুখি অবস্থানকে কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল করে দিতে সক্ষম হয়েছে। ফলে এর আগে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি যে কর্তৃত্বপরায়ণ অবস্থান উপভোগ করেছেন, এবার আর সেটা থাকছে না। কয়েক কোটি রুপির সারদা চিট ফান্ড এবং নারাদা কেলেঙ্কারিতে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের বহু সিনিয়র নেতার জড়িত থাকার খবর এসেছে।

মমতার আমলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পশ্চিমবঙ্গের দায় এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। বিপুলসংখ্যক চাকরিজীবীদের মহার্ঘ্য ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা দিতেও ব্যর্থ হয়েছে মমতার সরকার। জনকল্যাণমূলক নানা প্রকল্প টিকিয়ে রাখতে দৃষ্টিকটুভাবে তাকে কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আইন করে পশ্চিমবঙ্গের সব দেনা স্থগিত রাখার প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ফলে পশ্চিমবঙ্গের ৪২ আসনের মধ্যে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের ৩৪ আসনে জয়ের উচ্ছ্বাস অনেকটা অর্থহীন হয়ে পড়ে। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার নেতা মনজু মজুমদার বলেছেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সামনাসামনি দরকষাকষির ক্ষমতা এখন অন্য যেকোনও সময়ের তুলনায় কম।’

মজার বিষয় হচ্ছে, বিজেপি থেকে শুরু করে সিপিআই, সিপিআই (এম), কং (আই) কিংবা পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোনও রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিরোধিতা করেনি।

সিপিআই (এম) নেতা মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘নিম্ন তীরবর্তী একটি দেশের অধিকারকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে। আমাদের অনেকেরই বাংলাদেশে ঘরবাড়ি ছিল।’ এই অনুভূতি আরও অনেকের মধ্যেই রয়েছে।

মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘তাদের অভিযোগ বাংলাদেশিদের একটি অংশ অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করছে। তারা (তৃণমূল কংগ্রেস) কেন এটা বুঝতে পারছে না যে বাংলাদেশ যদি তার উত্তরাঞ্চলে সামান্য পরিমাণ পানি পায়, তাহলে এভাবে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের আশঙ্কা বেড়ে যাবে। তৃণমূল কংগ্রেস কি সেই দায় নেবে?’

দিল্লি কেন্দ্রিক বিজেপি নেতারা বলছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের অস্বস্তির বিষয়টি উপেক্ষা করছেন। তিস্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়কে আরও কাছাকাছি আনার বিষয়টি তিনি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে।